ডিজিটাল মার্কেটিং-এর কথা শুনলেই কি আপনার চোখে হাজার ডলারের বিজ্ঞাপন বাজেট আর বড় বড় কোম্পানির বিলবোর্ডের ছবি ভেসে ওঠে? আপনার কি মনে হয়, এত টাকা খরচ করা বা এর স্ট্র্যাটেজি বোঝা আপনার মতো ছোট বা মাঝারি ব্যবসার পক্ষে সম্ভব নয়?
কিন্তু বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। শুধু ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ই‑কমার্সে আয় হয়েছে প্রায় US $9 বিলিয়ন, যা ২০২৭ সালে US $13 বিলিয়ন পৌঁছাবে বলে ধারনা করা হচ্ছে, প্রতি বছর গড় বৃদ্ধি ≈ ১২%। (Payments Market Insights )এই সাপেক্ষে, দেশের প্রায় ৩০% মানুষ অনলাইনে নিয়মিত কেনাকাটা করে ,তাই এই দরজাটা বাইরে নয়, আপনারও কাজে আসতে পারে।।
ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা
“আমার হাজার ডলারের বাজেট লাগবে” মিথ
বাস্তবে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ফ্লেক্সিবল বাজেট। এখানে আপনি ১ ডলার দিয়েও বিজ্ঞাপন শুরু করতে পারেন। গুরুত্বপূর্ণ বাজেট নয়, বরং সেই বাজেটের সঠিক ব্যবহার। এখানে আপনি নির্দিষ্ট বয়স, এলাকা বা আগ্রহভিত্তিক গ্রাহকদের টার্গেট করতে পারেন, যা বিলবোর্ড বা প্রচলিত বিজ্ঞাপনের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর।
“শুধু ফেসবুক পোস্ট করলেই সেল আসবে” ভুল ধারণা
ফেসবুকে নিয়মিত পোস্ট দেওয়া ভালো, তবে এটি যথেষ্ট নয়। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে সফল হতে হলে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কিছু স্ট্র্যাটেজি। আপনার অডিয়েন্স কে, তারা কোন সময়ে অনলাইনে থাকে, কী ধরনের কনটেন্ট তাদের আকর্ষণ করে-এসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পোস্ট করতে হবে।
বুস্টিং এর বাইরেও ডিজিটাল মার্কেটিং এর জগৎ
অনেকে মনে করেন ডিজিটাল মার্কেটিং মানেই টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন দেয়া। কিন্তু এর বাইরেও এমন অনেক স্ট্র্যাটেজি আছে, যা আপনার ব্যবসাকে অর্গানিকভাবে এগিয়ে নিতে পারে:
- সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (SEO): বড় ব্র্যান্ডের মতো বাজেট ছাড়াও, SEO-এর মাধ্যমে আপনি গুগল সার্চে তাদের পাশে জায়গা করে নিতে পারেন। যখন কোনো অ্ডিয়েন্স আপনার পণ্য বা সেবা লিখে সার্চ করবে, তখন আপনার ওয়েবসাইটকে খুঁজে পাওয়াই SEO-এর কাজ।
- কনটেন্ট মার্কেটিং: অ্ডিয়েন্সের জন্য উপকারী এবং আকর্ষণীয় ব্লগ, ভিডিও বা ইনফোগ্রাফিক তৈরি করে তাদের মধ্যে ব্র্যান্ড সম্পর্কে আগ্রহ এবং বিশ্বাস তৈরি করা হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহক ধরে রাখতে সাহায্য করে।
- ইমেইল মার্কেটিং: এটি টার্গেটড অডিয়েন্সের ইনবক্সে আপনার মেসেজ পৌঁছে দেয়ার একটি কার্যকর উপায়। ইমেইল মার্কেটিং এর মাধ্যমে অডিয়েন্সেকে নতুন অফার বা আপডেট জানানো যায়।
- অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং: অন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আপনার পণ্যের প্রচার এবং বিক্রির একটি কৌশল হলো অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং। এটি B2B এবং B2C উভয় ক্ষেত্রেই দারুণ কার্যকর।
কেন নতুন ব্যবসার জন্য ডিজিটাল মার্কেটিং প্রয়োজন?
- টার্গেটেড অডিয়েন্স: আপনি ঠিক সেই গ্রাহকদের কাছেই পৌঁছাতে পারবেন, যারা আপনার পণ্য কিনতে আগ্রহী।
- পরিমাপযোগ্য ফলাফল (Measurable Result): প্রতিটি টাকার হিসাব রাখা সম্ভব। কতজন আপনার বিজ্ঞাপন দেখল, কতজন ওয়েবসাইটে আসল এবং কতজনের কাছে বিক্রি হলো সবকিছুই ট্র্যাক করা যায়, যা আপনাকে সর্বোচ্চ রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (ROI) পেতে সাহায্য করে।
- কম্পিটিশনে টিকে থাকা: আপনার প্রতিযোগী যদি ডিজিটাল মাধ্যমে সক্রিয় থাকে, তবে আপনার পিছিয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই।
আমাদের দেশেরই কিছু উদাহরণ
বিদেশের কথা বাদই দিলাম, আমাদের দেশেই এমন অনেক ব্র্যান্ড আছে যারা ডিজিটাল মার্কেটিংকে কাজে লাগিয়ে শূন্য থেকে শুরু করে আজ সফল।
- Takeout: এই ফুড ব্র্যান্ডটি কোনো গতানুগতিক বিজ্ঞাপন ছাড়াই, শুধুমাত্র বাঙালির রসবোধ এবং সংস্কৃতিকে ব্যবহার করে মজাদার ও relatable কনটেন্ট তৈরি করে তরুণ প্রজন্মের কাছে তুমুল জনপ্রিয় হয়েছে।(Brandmark)
- 10 Minute School: বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই অনলাইন এডুকেশন প্ল্যাটফর্মটি মূলত ভ্যালুয়েবল কনটেন্ট (শিক্ষামূলক ভিডিও, লাইভ ক্লাস, ব্লগ) দিয়ে তাদের বিশাল অডিয়েন্স তৈরি করেছে। তাদের সাফল্যের পেছনে কনটেন্ট মার্কেটিংয়ের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।(Business Inspection)
- RISE: দেশীয় এই ফুটওয়্যার ব্র্যান্ডটি ইন্সটাগ্রাম এবং ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মে আকর্ষণীয় ভিজ্যুয়াল কন্টেন্ট এবং কমিউনিটি বিল্ডিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের একটি শক্তিশালী লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।(Tbsnews)
আপনার ব্যবসার জন্য একটি স্ট্র্যাটেজিক রোডম্যাপ
- আপনার মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি কী? প্রথমে আপনার ব্যবসার মূল লক্ষ্য ঠিক করুন। আপনি কি সেলস বাড়াতে চান, নাকি ব্র্যান্ড পরিচিতি?
- একটি মার্কেটিং প্ল্যান তৈরি করুন- আপনার স্ট্র্যাটেজিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য একটি বিস্তারিত প্ল্যান তৈরি করুন। কোন চ্যানেলে (ফেসবুক, গুগল, ইমেইল) মার্কেটিং করবেন, বাজেট কত থাকবে এবং কতদিনের জন্য ক্যাম্পেইন চলবে এই বিষয়গুলো এখানে ঠিক করুন।
- সঠিক প্ল্যাটফর্ম বেছে নিন- আপনার গ্রাহকদের ওপর ভিত্তি করে সঠিক প্ল্যাটফর্ম (যেমন: ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, ইউটিউব, গুগল) বেছে নিন।
- ভ্যালুয়েবল কনটেন্ট তৈরি করুন- শুধুমাত্র “পণ্য কিনুন” এই ধরনের পোস্ট না দিয়ে এমন কনটেন্ট তৈরি করুন যা আপনার অডিয়েন্সের জন্য উপকারী।
- ফলাফল পরিমাপ ও অপটিমাইজ করুন- আপনার ক্যাম্পেইনের পারফরম্যান্স নিয়মিত ট্র্যাক করুন এবং ডেটার ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজন অনুযায়ী আপনার প্ল্যান অপটিমাইজ করুন।
প্রচলিত কিছু প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন: আমার বাজেট খুবই কম, আমি কি ডিজিটাল মার্কেটিং করতে পারব?
উত্তর: অবশ্যই পারবেন। ফেসবুক বা গুগলে খুব অল্প খরচেও অ্যাড দেওয়া যায়। মূল বিষয় হলো, আপনার বাজেট কম হলেও সেটিকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা।
প্রশ্ন: ডিজিটাল মার্কেটিং থেকে ফল পেতে কতদিন সময় লাগে?
উত্তর: এটি নির্ভর করে আপনার ব্যবসার ধরন, লক্ষ্য এবং মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজির ওপর। কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত ফল পাওয়া গেলেও, ব্র্যান্ডের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে এবং দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য পেতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হয়।
প্রশ্ন: আমার ব্যবসার জন্য কোন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মটি সেরা?
উত্তর: এটি সম্পূর্ণভাবে আপনার ব্যবসার ধরন এবং আপনার গ্রাহকদের ওপর নির্ভরশীল। যেমন, ফ্যাশন বা লাইফস্টাইল পণ্যের জন্য ইন্সটাগ্রাম খুব কার্যকর, আবার বিভিন্ন সেবা বা তথ্যের জন্য ফেসবুক বা ইউটিউব ভালো কাজ করে।
পরিশেষে বলা যায়, ডিজিটাল মার্কেটিং কোনো রকেট সায়েন্স নয়, আর এটি শুধু বড় ব্র্যান্ডের জন্য সীমাবদ্ধও নয়। এটি আপনার মতো উদ্যোক্তাদের জন্যই সবচেয়ে বড় সুযোগ, যেখানে কম খরচে বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো সম্ভব।
আজই ফ্রি কনসালটেশন বুক করুন এবং আপনার ব্যবসার জন্য একটি কাস্টম ডিজিটাল মার্কেটিং রোডম্যাপ তৈরি করুন।